ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ , ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকৌশলী রাজীব খাদেমের দুর্নীতির মহোৎসব || দেখার কেউ নেই ​ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে

আপলোড সময় : ১৫-০৪-২০২৬ ০৪:১৬:১২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৫-০৪-২০২৬ ০৪:১৬:১২ অপরাহ্ন
প্রকৌশলী রাজীব খাদেমের দুর্নীতির মহোৎসব || দেখার কেউ নেই   ​ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ রাজীব খাদেমের

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ রাজীব খাদেমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি দিন দিন দীর্ঘতর হচ্ছে, যা বর্তমান নগর প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে চরম সংকটে ফেলেছে। গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দায়েরকৃত একটি হত্যা মামলায় ৩৪ নম্বর আসামি (মামলা নং ২২৪/২৫) হওয়া সত্ত্বেও তার প্রশাসনিক দাপট ও অনৈতিক কার্যক্রম বিন্দুমাত্র কমেনি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট (ডিসিএনইউপি)’-কে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যক্তিগত কমিশন বা ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সূত্রে জানা গেছে, ১২ কোটি টাকার একটি ক্ষুদ্র প্রকল্প থেকেও তিনি ২৫ শতাংশ হারে কমিশন দাবি করতেন এবং টাকা দিতে অস্বীকার করলে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতেন। এই প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গণপরিসর, পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়নের কাজ চললেও রাজীব খাদেমের একক আধিপত্যের কারণে অধিকাংশ কাজই এখন মাঝপথে থমকে আছে।

বিশাল সিন্ডিকেটে জিম্মি নগরীর উন্নয়ন প্রকল্প
- বিশ্বব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুটে নেয়ার মহোৎসব
- মামলা ও আইনি জটিলতা তুচ্ছ করে অনিয়ম
- নিয়োগ জালিয়াতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র
- প্রশাসনিক ক্ষমতা অপব্যবহারে কোণঠাসা সৎ কর্মকর্তারা

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্পের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জালিয়াতি ও রদবদল করে রাজীব খাদেম তার নিজস্ব একটি দুর্নীতির বলয় তৈরি করেছেন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রথমে প্রেম রতন বাবু এবং পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদকে নিয়োগ দিয়েও সামান্য মতভেদ হওয়ায় তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রকল্পের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজীব খাদেমের ইচ্ছামতো কাজ না করলে বা তার অনৈতিক বিলে সই না করলে কর্মকর্তাদের মানসিক চাপের মুখে রাখা হতো। এমনকি বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের কাছে ভুল তথ্য দিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও বাজেট বাড়ানোর পাঁয়তারা করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ডিএসসিসির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কোনো বড় প্রকল্পের পরিচালক যদি দুর্নীতির সাথে সরাসরি যুক্ত থাকেন, তবে সেই প্রকল্পের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব।

রাজীব খাদেমের দুর্নীতির বিস্তার কেবল বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী নর্থব্রুক হল বা লালকুঠি সংস্কার প্রকল্পেও তার থাবা পড়েছে। হেরিটেজ সংরক্ষণের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই কাজে প্রত্নতাত্ত্বিক নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট আর্কিটেক্ট ও ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন, সংস্কারের নামে প্রাচীন এই স্থাপনার মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের দায়িত্ব পালনকালে যাত্রী ছাউনি নির্মাণ ও ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়ন প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় করার অসংখ্য প্রমাণ মিলেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, রাজীব খাদেমকে কাজের শুরুতেই নির্দিষ্ট অংকের টাকা অগ্রিম দিতে হতো, অন্যথায় ফাইলের ওপর লাল দাগ দিয়ে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হতো।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল আধুনিকায়ন প্রকল্প এবং রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে ডিজিটাল বোর্ড বসানোর কাজেও বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজীব খাদেমের সরাসরি হস্তক্ষেপে কিছু অখ্যাত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বড় বড় কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ডিএসসিসির অনেক সৎ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজীব খাদেমের রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট এতই বেশি যে, তার বিরুদ্ধে কথা বললে বদলি বা বিভাগীয় মামলার ভয় দেখানো হতো। এমনকি ছাত্র আন্দোলনে হত্যা মামলার আসামি হয়েও তিনি কীভাবে নিয়মিত দপ্তরে বসে নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নতুন নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়া তদারকি করছেন, তা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজীব খাদেমের বিরুদ্ধে আসা প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এ নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা যিনি আবার হত্যা মামলার আসামি, তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। রাজীব খাদেমের এই অব্যাহত দুর্নীতি কেবল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক ক্ষতি করছে না, বরং পুরো নগর উন্নয়ন প্রক্রিয়াকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করে তার সকল প্রকল্পের ফরেনসিক অডিট করা এবং অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের হিসাব নেওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

তবে এতসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী রাজীব খাদেমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি এবং তিনি বর্তমানে গা ঢাকা দিয়ে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ